আমরা জাতিকে কাঙ্ক্ষিত একটি ঐক্য উপহার দিতে চাই

যুব মজলিস একটি আশার প্রদীপ। এই সময়ের যুবকদের একটি বিশ্বাসী প্লাটফর্ম। দলে দলে সারাদেশে তৃণমূল পর্যায়ে যুবক ও তরুণ শ্রেণির মানুষ যুব মজলিসকে তাদের আস্থার ঠিকানা হিসেবে গ্রহণ করছে। দিনদিন যুব মজলিসের পরিবার বাড়ছে। আশার বাণী ও স্লোগান চারদিকে ছড়াচ্ছে। মিছিলে মিছিলে তরুণসমাজ তাদের সমর্থন ও যোগদান সম্মতি জ্ঞাপন করছে। যুব মজলিসকে নিয়ে অনেকেই সম্ভাবনার কথা ভাবছে ও বলছে। আশা নিরাশার বিগত দশবছর পেড়িয়ে আজকের এ প্রান্তে সংগঠনকে দাঁড় করাতে যাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা আর রক্ত ঘাম ঝড়ছে তাদের সর্বাগ্রে আছেন যুব মজলিসের সভাপতি মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক। সাম্প্রতিক সময়ের অস্থিরতা ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর অনুভূতি কী, কিভাবে এতোদূর আসলেন, সামনে কি পরিকল্পনা- এসব জানতে তার মুখোমুখি হয়েছে ‘দশবছর পূর্তি স্মারক প্রতিনিধি’। -সম্পাদক

 

স্মারক প্রতিনিধি : অনেক প্রতিকূল পরিবেশের মাঝ দিয়ে আজ এ পর্যায়ে সংগঠনের ১০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিস। সংগঠনের একজন কর্ণধার ও সভাপতি হিসাবে আপনার অনুভূতি কী?

মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক : আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন প্রাণপ্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিস ইতোমধ্যেই তার প্রতিষ্ঠার দশবছর পূর্ণ করেছে। সংগঠনের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আগামী ১৫ই নভেম্বর’ ১৯ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দশবছর পূর্তি সম্মেলন। দশবছর পূর্ণ হওয়া এটা ভালো বা খারাপ লাগার কোন বিষয় নয়। শুধু সময়ের স্বাভাবিক পরিক্রমণ। অনুভূতির বিষয় হলো এই দশ বছরে আমাদের সংগঠন কতদূর অগ্রসর হতে পারল? এ বিষয়ে আমার অনুভূতি হল প্রাথমিকভাবে সংগঠন শুরুর সময়ে যতটা সহজ হবে অনুমান করে কার্যক্রম আমরা শুরু করেছিলাম, বাস্তবতা মনে হয়েছে তার চেয়ে অনেক কঠিন। তাই কাজ শুরু করার আগের স্বপ্ন ও কল্পনাকে আমরা ছুঁতে পারিনি। তবে সংগঠনের কাজ শুরু করার পর পর যে ধরনের বাধা-প্রতিবন্ধকতা, হতাশা-প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছিলাম সেই জায়গা থেকে দশবছর পথ চলার পর আজ আমি সত্যিই আপ্লুত। সংগঠন অনেক দূর এগিয়েছে-একথা বলতে না পারলেও সংগঠনের একটি ভিত তৈরি হয়েছে এবং সম্ভাবনার উদয় ঘটেছে এটি অবশ্যই বিশ্বাস করি। সেই জায়গা থেকে সংগঠনের দশবছর পূর্তি সম্মেলনকে নিয়ে দায়িত্বশীল, কর্মী, সদস্য, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে যে আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস লক্ষ করছি, সংগঠনের একজন দায়িত্বশীল হিসেবে অবশ্যই এতে আমি আনন্দিত এবং আল্লাহর দরবারে শোকরগুজার।

 

স্মারক প্রতিনিধি : কী লক্ষ্য নিয়ে যুব মজলিস যাত্রা শুরু করেছিল?

মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক : যুব মজলিসের প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য ছিল আল্লাহর দীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে নিবেদিতপ্রাণ একদল দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তি গঠনের মাধ্যমে এমন একটি সংগ্রামী কাফেলা তৈরি করা, যারা আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দীনের ঝান্ডা সমুন্নত করতে প্রাণপণে লড়াই করবে, দীনবিরোধী যেকোনো কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিবে, সর্বোপরি আল্লাহর জমিনে খেলাফত কায়েমের মাধ্যমে দীন বিজয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করবে।

স্মারক প্রতিনিধি : আপনি গত দশবছর যাবৎ সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বিকল্প কোনো দায়িত্বশীল এ জায়গাতে আসতে না পারাকে সংগঠনের দুর্বলতা নাকি আস্থা ও আনুগত্যের প্রতীক বলে মনে করছেন?

মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক : সংগঠনের বিকল্প নেতৃত্ব ও দায়িত্বশীল এ পর্যায়ে না আসাকে আমি অবশ্যই একটি শূন্যতা বলেই বিবেচনা করি। একটি পূর্ণাঙ্গ ও ভারসাম্যপূর্ণ সংগঠনের জন্য কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় মূল দায়িত্বগুলো পালনের জন্য একাধিক ব্যক্তি সমপর্যায়ের থাকা উচিত। তবে একজন দায়িত্বশীল ধারাবাহিকভাবে একটি সংগঠনের মূল দায়িত্বে থাকা এটি কোনো সংগঠনের দুর্বলতা নয়; বরং এটি ইসলামের মূল চেতনা। একজন দায়িত্বশীল যতদিন সুস্থ স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম থাকবেন, বড় ধরনের কোনো পদস্খলন না হলে তাকে অপসারণ করা অথবা অব্যাহতি দেওয়া ইসলামি ইমারত তথা নেতৃত্ব নির্বাচন সংক্রান্ত মৌলনীতির পরিপন্থী।

স্মারক প্রতিনিধি : আপনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব, একই সঙ্গে যুব মজলিসের সভাপতি। দুটিকে কিভাবে সমন্ময় করছেন?

মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক : বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্বটা আমার জন্য অনেকটাই আলঙ্কারিক। সংগঠনের সাথে সমন্বয় রক্ষা করা এবং বৃহত্তর পরিসরে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে দায়িত্বে থাকা। প্রকৃত অর্থে আমি খেলাফত যুব মজলিসের দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করি। আর খেলাফত মজলিসের সাথে সমন্বয়ের জন্য যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে ভূমিকা পালন করাকে সহায়কই মনে হয়।

স্মারক প্রতিনিধি : যুব মজলিস কী দশবছরে  কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছে? সংগঠনের সাফল্য ও ব্যর্থতা কতটুকু মনে করেন? 

মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক : কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছার বিষয়টি পূর্বেই উল্লেখ করেছি। মূলত একটি সংগঠনের কার্যক্রম শুরু করার আগে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় সেটা অনেক সময়ই বাস্তবতার সাথে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যশীল হয় না। কার্যক্রম কিছুদিন পরিচালনা করার পর লক্ষ্যমাত্রার পুনর্মূল্যায়ন করতে হয় এবং সেটাই বাস্তবতা নির্ভর হয়। যুব মজলিসের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। কাজ শুরু করার পূর্বে লক্ষ্যমাত্রা ছিল অনেকটা কল্পনাবিলাসী। কাজ শুরুর পর বাস্তবতার নিরিখে পুনর্মূল্যায়ন করে আমরা যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণকরেছি, আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর রহমতে সংগঠন সেই লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পেরেছে এবং সেভাবেই সামনে অগ্রসর হচ্ছে। সংগঠনের সাফল্য এখানেই। আজকে বাংলাদেশের ধর্মীয় অঙ্গনে একটি সম্ভাবনাময় নাম হিসেবে যুব মজলিস অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে যুব তরুণসমাজ নিজেদের পক্ষ থেকে আগ্রহী হয়ে যুব মজলিসকে জানছে এবং অংশগ্রহণ করছে। অতিসম্প্রতি সংগঠন দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিস্তার লাভ করেছে। এটি সংগঠনের সফলতা। আর কিছু ব্যর্থতার জায়গা যে নেই তা নয়, নেতৃত্ব গঠনের ক্ষেত্রে সংগঠনের ভূমিকা এখনো সম্ভাবনাময় পর্যায়ের। কার্যকর রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের শূন্যতা আছে। সেটা তৈরি করতে সময় লাগবে।

স্মারক প্রতিনিধি : একজন মামুনুল হককে নিয়ে এ জাতির স্বপ্ন যেমন হতাশার গল্পও আছে মাঠে ময়দানে। আপনি এটাকে কীভাবে দেখেন?

মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক : একজন ব্যক্তিকে নিয়ে জাতির খুব কিছু স্বপ্ন থাকার কথা নয়। তবে হয়তো কিছু কিছু বিষয় দেখে বিশেষ করে শাইখুল হাদিসের রক্তের ঔরস্যের কারণে অনেকে অনেক রকম স্বপ্ন দেখেন। আমি তাদের এ স্বপ্নকে আমার জন্য অনেক বড় বোঝা মনে করি। মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা আমার জন্য অনেক কঠিন মনে হয়। বাকি হতাশার গল্পগুলোর কথা, সেটা আমার কাছে পরিষ্কার না। হয়তো কেউ কেউ মাত্রাতিরিক্ত আবেগ প্রবণ আশা পোষণ করে, আবার ক্ষণিকের মোহভঙ্গে হতাশ হয়ে পড়ে এমন কিছু হয়ে থাকতে পারে।

স্মারক প্রতিনিধি: ব্যক্তি জীবনে সমালোচনাকে কীভাব গ্রহণ করেন?

মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক : সমালোচনা মানুষকে সংশোধন হতে পথ দেখায়। ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে শেখায়, যদি তা সঠিক উদ্দেশ্যে যথাযথ পন্থায় হয়। সেই সমালোচনাকে স্বাগত জানাতে কার্পণ্য করার মতো নির্বোধ আমি নই। আল্লাহর মেহেরবানি এতোটুকু বিবেক আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন।

স্মারক প্রতিনিধি : ইসলামি দলগুলোর ঐক্য নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক : বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ইসলামি দলগুলোর ঐক্য একটি দুরূহ বিষয়। তবে বৃহত্তর ক্ষেত্রে ইস্যুভিত্তিক ঐক্যের নজির অতীতে রয়েছে এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটেও সম্ভব। তবে দীর্ঘমেয়াদি ঐক্যটা অনেক কঠিন। সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন। অতি আবেগী নয়; বরং ধীরস্থিরে ও বাস্তবতার উপলব্ধি নিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে ঐক্যের ভীত রচনা করে কাক্সিক্ষত ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। আমি আশা করি ইনশাআল্লাহ এমন একটি কাঙ্ক্ষিত ঐক্য আমরা জাতিকে উপহার দিতে পারব। আর এমন একটি ঐক্যের লক্ষ্যে কাজ করাকে আমি আমার জীবনের অন্যতম মিশন হিসেবে ভাবি।

স্মারক প্রতিনিধি : বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সহযোগী সংগঠন হিসেবে কাজকরছে বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিস। যুব মজলিসেরও একটি ছাত্র শাখা রয়েছে। খেলাফত মজলিসেরও ছাত্র শাখা রয়েছে। একটি সহযোগী সংগঠনের ছাত্র শাখা কী মূল সংগঠনের ছাত্র শাখার কার্যক্রমে প্রশ্ন বা ব্যাঘাত সৃষ্টি করে না?

মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক : বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিস মূলত একটি পূর্ণাঙ্গ আন্দোলন ও সংগঠনের চিন্তা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নিকট অতীত ও বর্তমান পথ চলার ক্ষেত্রে যুব মজলিসকে সর্বোচ্চ বৃহত্তর আন্দোলনের ক্ষেত্রে খেলাফত মজলিসের সহযোগী সংগঠন বলা যায়। যুব মজলিস যে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সেজন্য ছাত্রদের মধ্যে সংগঠনের কাজ করা অপরিহার্য। তাই কোনোভাবেই ছাত্রদের মধ্যকার কার্যক্রমকে সংকুচিত করা যুব মজলিসের পক্ষে সম্ভব নয়। আর তাছাড়া যুব মজলিস সংগঠনকে ইসলামি আন্দোলনের সৈনিক গড়ার প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করে। খেলাফত মজলিসের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ইসলামি ছাত্র মজলিসও যদি নিজেদেরকে আন্দোলনের কর্মী গঠনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করতে পারে তাহলে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন শিক্ষার জন্য প্রতিবন্ধক নয়, একাধিক ছাত্র সংগঠনেও সমস্যা দেখি না।

স্মারক প্রতিনিধি : সংগঠন নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক : সংগঠন নিয়ে আমার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও পরিকল্পনা হলো একটি সুন্দর, মজবুত ও শক্তিশালী ইসলামি আন্দোলনের দুর্গ গড়ে তোলা, দেশব্যাপী ইসলাম, মানবতা ও দেশের পক্ষে যারা একযোগে কাজ করতে পারে এবং এই সংগঠনের মাধ্যমে বৃহত্তর ঐক্যের কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরি হতে পারে।

স্মারক প্রতিনিধি : যুব মজলিসের কর্মীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক : যুব মজলিসের কর্মীদের উদ্দেশ্যে আমার কথা হলো তারা যেন যুব মজলিসকে ভালোভাবে আত্মস্থ করার চেষ্টা করেন। যুব মজলিসের কর্মসূচিগুলোকে তারা যেন হৃদয় দিয়ে অনুধাবন ও সাধ্যের সবটুকু উজাড় করে পরিপালনে যত্নবান হন। সংগঠনের বক্তব্যগুলো আত্মস্থ করেন। সংগঠনের কর্মসূচিগুলো নিয়মিত পালন করেন। সর্বোপরি নিজেকে আল্লাহর পছন্দনীয় একজন ব্যক্তি এবং ইসলামি আন্দোলনের সৈনিক হিসেবে গড়ে তোলার সর্বাত্মক চেষ্টা চালান।

স্মারক প্রতিনিধি : স্মারক কমিটির পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক : স্মারক কমিটিকেও ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করি। আপনারা সংগঠ-ে নর দশবছর পূর্তির মাইলফলককে স্মরণীয় ও অনুসরণীয় করে রাখার জন্য যে চেষ্টা সাধনা পরিশ্রম করছেন আল্লাহ আপনাদেরকে এর উত্তম বিনিময় দান করুন।

শেয়ার করুন
Scroll to Top