সরকারের তোষামোদিকে তরুণরা ভালো চোখে দেখে না : মাওলানা মাহফুজুল হক

মাওলানা মুফতি মাহফুজুল হক দা.বা.। সকল পরিচয় ছাপিয়ে তিনি বাংলাদেশে ইসলামি আন্দোলনের একজন একনিষ্ঠ খাদেম। ইসলামি আন্দোলনের কর্মীদের জন্য আদর্শের প্রতীক। আন্দোলন, রাজনীতি, শিক্ষা সর্বক্ষেত্রে তাঁর সরব উপস্থিতি। পরিচয়টাও বেশ সমৃদ্ধ। শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এর সাহেবজাদা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব। কর্মজীবনে ঢাকার জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার প্রিন্সিপাল।
হাদিসের আলো বিলান বাবার মতো দরদ নিয়েই। ইসলামি রাজনীতি করছেন সেই ছাত্রকাল থেকেই। শাইখুল হাদিসের আন্দোলন বিপ্লবের একজন উপস্থিত কর্মী। সেই জীবনে আছে কারাবরণের গৌরব। পুরানো অভিজ্ঞতা নিয়েই ইসলামি রাজনীতির মঞ্চে বক্তৃতা করেন উচ্চ সাহসে। একদিনের সন্ধ্যায় বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের দশবছর পূর্তি সম্মেলন উপলক্ষ্যে সময়ের ইসলামি আন্দোলন, ঐক্য অনৈক্যসহ বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা হয় মাওলানা মাহফুজুল হকের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ওমর শাহ, জাহিদুজ্জামান, আল আবিদ শাকির ও মুর্শিদ সিদ্দিকি।

স্মারক প্রতিনিধি : বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির এক ক্রান্তিকাল চলছে। অনৈক্য, ভাঙন, সরকারতোষামোদি ইসলামি নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে আপনার মতামত কী?

মাওলানা মাহফুজুল হক: বাংলাদেশে ইসলামি আন্দোলনের ক্রান্তিকাল- এ কথাটাতো বাস্তব। আসলে বিশেষ করে শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ., মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ. এর ইন্তেকালের পর ইসলামি আন্দোলনের ময়দানে একটি ক্রান্তিকালই চলছে এবং আমরা ঐক্যের আহবান জানাই। কুরআন-সুন্নাহের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ইসলামি শক্তির অন্যতম একটি উৎস হলো ঐক্য। সেই ক্ষেত্রে অনাকাঙ্খিতভাবে আমরা ইসলামি আন্দোলনের ময়দানে ঐক্য করতে বা ঐক্য দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছি। এরপরেও এতোটুকু তো আছে, কোনো ইস্যু কেন্দ্রিক আমাদের ইসলামি দলগুলোর মাঝে ঐক্য গড়ে উঠে এবং সেই ঐক্যের মাধ্যমে যথেষ্ট ফলাফলও সামনে আসে। পাশাপাশি এ বিষয়টাও সামনে আসে- অনৈক্য থাকলেও ঐক্যের সম্ভাবনা আছে। তবে অনৈক্যের পিছনে বড় কারণ হলো, আস্থাবান মজবুত নেতৃত্ব শূন্যতার কারণে মনে হয় সম্ভাবনাময় ঐক্য আমাদের মাঝে আসছে না। সেই হিসেবে ঐক্যের ব্যাপারে একদিকে হতাশাও আছে, আবার আশাও আছে। তাই ইসলামি আন্দোলনের ময়দানে ঐক্যের ক্ষেত্রে ক্রান্তিকাল চললেও আশাবাদী ঐক্যের সম্ভাবনাও আছে।
ইসলামি নেতৃত্বে সরকার তোষামোদির বিষয়টা মূলত দীর্ঘ প্রায় ১২-১৩ বছরের রাজনৈতিক চর্চা। বিরোধী চিন্তা-মতকে একেবারেই সহ্য করা হচ্ছে না। আসলে যেখানে এ ধরনের পরিবেশ গড়ে উঠে তখন ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে ন্যূনতম অধিকার আদায়, প্রয়োজন পূরণের জন্যও সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখে। আর ওই সম্পর্কটাই একটা পর্যায়ে নিজেদের অজান্তেই তোষামোদির রূপ নেয়। বর্তমানে এ ধরণের একটা পরিস্থিতি চলছে। তাই এ পরিস্থিতিতে সবাইকেই তোষামোদি মানসিকতার বলে আমি মনে করি না। বরং অনেকেই প্রয়োজনের খাতিরে, নূন্যতম অধিকার আদায়ের জন্য সরকারের সাথে সুসম্পর্ক রাখে। কিন্তু রাখতে রাখতেই একটা পর্যায়ে তার একটা খারাপ পরিণতি বা প্রতিক্রিয়া হিসেবেই সেটা নিজের অজান্তেই খারাপ তোষামোদিতে পৌঁছে যায়। তাই আমি মনে করি, ইসলামি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের মাঝে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা থাকা প্রয়োজন। আমাদের পথচলা, সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখা এটা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়ে তোষামোদি পর্যায়ে পৌঁছে গেল কিনা? এ বিষয়ের আলোচনা থাকলে আমি মনে করি, এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে না। আর আমরা এতে জড়িয়ে পড়লেও বের হয়ে আসার সুযোগ তৈরি হবে, ইনশাআল্লাহ।
মোটকথা, মানসিকভাবে সবাই তোষামোদি মানসিকতার হয়ে গেছে বলে আমি সেটা মনে করি না। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রয়োজনের জন্য অনেকের ক্ষেত্রে এমনটা দেখা যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ সেই তোষামোদির দিকে অগ্রসর হয়ে যেতেও পারে। অনৈক্য এবং তোষামোদির বিষয়ে তরুণরা অনেক বেশি নেতিবাচক মনোভাব লালন করে এবং তার চেয়েও বেশি প্রকাশ করে। তারা যদি এ বিষয়টা ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করত, আলোচনায় নিয়ে আসত তাহলে তা আরও কার্যকর হতো বলে আমি মনে করি।

স্মারক প্রতিনিধি : অনেকটাই দিশেহারা নেতৃত্বের মতো চলছে ইসলামি আন্দোলন। নিকট অতীতে শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক ও মুফতী আমিনী রহ. এর পর শক্তিশালী কোনো নেতৃত্ব আসেনি ইসলামি আন্দোলনে। এর কারণ কী বলে মনে করছেন?

মাওলানা মাহফুজুল হক : এটি হলো একটি কুদরতি বিষয়ও। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন একেক সময় একেক হালাত তৈরি করেন। কোনো সময়ে যোগ্য মানুষ সহজভাবে তৈরি হয়ে আসে। আবার কখনো যোগ্য মানুষের অভাব পরিলক্ষিত হয়।
তাছাড়া ইসলামি আন্দোলনের ময়দানে যোগ্যলোক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যে ধরনের প্রচেষ্টার প্রয়োজন ছিল, নিকট অতীতে হয়তো তার মধ্যে ঘাটতি ছিল। যার ফলে বর্তমান সময় নেতৃত্বের শূন্যতা প্রকট আকারে আমরা অনুভব করছি।
আরেকটি বিষয় হলো, পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে এ ময়দানের নেতৃত্বটা এমন লোকদের হাতে চলে যাচ্ছে, যারা আসলেই এ ময়দানে ভূমিকা রেখে অভ্যস্থ নয়। তারা ব্যক্তি হিসেবে অনেক বড়। তাদের ব্যক্তিত্বের কারণে, এ ময়দানে যারা যোগ্য ছিল, তারা ওই সকল ব্যক্তিত্বের কারণে এ ময়দানের সম্ভাব্য যোগ্য নেতৃত্ব অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। আমি আশা করি, আল্লাহ চাহে তো এভাবে চেষ্টা চলতে থাকলে সময়ের প্রেক্ষিতে কোনো ভালো যোগ্য নেতৃত্ব চলে আসবে, ইনশাআল্লাহ।

স্মারক প্রতিনিধি : ভোটের রাজনীতিতেও উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা নেই ইসলামি দলগুলোর। আলেম উলামাশূন্য পার্লামেন্ট নেতৃত্ব। এটাই কী ইসলামি দলগুলোর পিছিয়ে পড়ার বড় উদাহরণ নয়

মাওলানা মাহফুজুল হক: ২০০১ সালের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি যেহেতু জোটবদ্ধ হয়ে গিয়েছে, জোটের বাইরে বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ কম। তাছাড়া ভোটের রাজনীতিতে ধারাবাহিক, নিয়মিত ময়দানে থাকা প্রয়োজন। ইসলামি দলগুলোর এক্ষেত্রে যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে। সে হিসেবে তারা ভোটের রাজনীতিতে পিছিয়ে পড়ছে। একনায়কতন্ত্র মনোভাবের কারণে শুধু ইসলামি দলগুলোই নয়, দীর্ঘদিন যাবৎ ক্ষমতায় থাকা দলগুলোও পিছিয়ে পড়ছে।

স্মারক প্রতিনিধি : স্বাধীনতার আটচল্লিশ বছরে ইসলামি দলগুলো মানুষের আশা আকাঙ্খার কী প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছে বলে মনে করেন?

মাওলানা মাহফুজুল হক: ইসলামি আন্দোলনের চূড়ান্ত যে লক্ষ্য তা থেকে তো এখনো অনেক পিছিয়ে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমাদের যতটুকু অগ্রসর হওয়ার কথা ছিল ততটুকু আমরা অগ্রসর হতে পারিনি। এর বাইরে প্রাথমিক যে ধাপগুলো রয়েছে যেমন মানুষের মাঝে ইসলামি চেতনা জাগ্রত করা, ইসলামের অনুশীলন এবং ইসলাম বিরোধী যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করা, এ সকল ক্ষেত্রে দেখা যাবে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ইসলামি দলগুলোর নেতৃবৃন্দের বড় ভূমিকা বিভিন্ন সময় আমাদের সামনে এসেছে। আর চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে পিছিয়ে পড়ার বড় কারণ হিসেবে আমি মনে করি, যোগ্য নেতৃত্ব ও যোগ্য কর্মীবাহিনী গড়ে তোলা এবং সমাজের সর্বক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করার মতো যোগ্যলোক তৈরি করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার বড় অভাব।

স্মারক প্রতিনিধি : তালীমে দ্বীন ও তাবলীগে দ্বীনের মতো তাগলীবে দ্বীনের প্রশিক্ষণও কওমি অঙ্গনে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়ন পায় না কেন?

মাওলানা মাহফুজুল হক: ইসলামি নেতৃত্বের অনৈক্যটাকেই আমি বড় কারণ বলে মনে করি। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো তাগলীবে দ্বীনের বিষয় নিয়ে ভাববে সে সুযোগটাই পাচ্ছে না। তালীম ও তাবলীগের বিষয়ে আমাদের মধ্যে বিভক্তিটা কিন্তু এতটা প্রকট না। পাশাপাশি তালীম ও তাবলীগের কাজের নেচার হলো- এটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক, এককভাবে হতে পারে। কিন্তু তাগলীবে দ্বীনের কাজটা সংঘবদ্ধ হওয়া ছাড়া এককভাবে করা যায় না। আর ইসলামি আন্দোলনের ময়দানের নেতৃবৃন্দ অল্প কিছুদিন ঐক্যবদ্ধ থাকলেও তারপরে আবার তাদের মধ্যে বিভক্তি চলে আসে। যার ফলে তারা যে চিন্তা করবে- এ আদর্শের ছাত্র গড়ে তোলার সুযোগ সেভাবে হয়ে ওঠে না। অন্যথায় আমি মনে করি, ঐক্যবদ্ধভাবে যদি আমরা দীর্ঘদিন কাজ পরিচালনা করতে পারতাম উদাহরণস্বরূপ: হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর সময়ের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন যদি আর দশটা বছর চলত তাহলে দীনি প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাগলীবে দ্বীনের পরিবেশটা ভিন্ন হতো। এটাও আমরা দেখেছি, শাইখুল হাদীস রহ. এর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস যখন কাজটা নিয়মতান্ত্রিকভাবে গুছিয়ে নিয়ে এগুচ্ছিলেন তখন কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান এ সংগঠনের কার্যক্রমের ব্যাপারে তাদের ছাত্রদের মাঝে উৎসাহ সৃষ্টি করা, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিপূর্ণরূপে না হলেও অনেকাংশে তাদের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু পরবর্তীতে এ ধারা আমরা অব্যহত রাখতে পারিনি।

স্মারক প্রতিনিধি : কওমী শিক্ষা সিলেবাসেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেই। প্রাথমিকভাবে খেলাফতে রাশেদার জীবনকাহিনি পড়া হলেও আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের প্রশিক্ষণ বা ইসলামি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কোনো বই নেই। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

মাওলানা মাহফুজুল হক: আমাদের কওমি মাদরাসার মূল সিলেবাস ব্রিটিশ আমলেই তৈরি হয়েছে। তখনকার পরিস্থিতিতে তো রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা করার চেয়ে বড় বিষয় ছিল আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে ইসলাম রক্ষা করা। তালীম, তাবলীগ-দাওয়াত এবং ইসলামি খেলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা আছে, এই মূল চেতনা ধরে রাখা। সে সময়ের বাস্তবতার নিরিখে সেটাই ছিল কার্যকরী পদক্ষেপ। এবং সে আলোকেই সিলেবাসও প্রণয়ন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে পরিস্থিতির আলোকে তাতে যে সংযোজনের প্রয়োজন ছিল সেটা অতীত ধারাবাহিকতার কারণে আর হয়ে ওঠেনি বলা চলে। বাকি আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে ইসলামি আন্দোলনের ময়দানে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারতাম তাহলে এ বিষয়গুলো সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত হতো বলে মনে হয়। তবে যারা খুব চিন্তাশীল তারা কিন্তু এটা নিয়ে কাজ করেছেন। আমাদের বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ.। তিনি ইসলামি অর্থনীতি, ইসলামি রাষ্ট্রনীতি বিষয়ে বই লিখেছেন। সুতরাং আমাদের মধ্য থেকে বোর্ডের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তির লিখনী মানে- তিনি এটা চিন্তা করেছেন আমাদের ছাত্রদের মাঝে বিষয়টির চর্চা হওয়া প্রয়োজন। এছাড়াও ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে কওমি স্বীকৃতির বিষয়টা যখন বেশ কিছুদূর অগ্রসর হলো, সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তখন ১৬ বছরের একটা সিলেবাস প্রণীত হয়েছিল বড়দের যৌথ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। সেই সিলেবাসে কিন্তু এ বিষয়গুলো সংযোজিত হয়েছিল। মোটকথা, এ বিষয় নিয়ে বড়দের মধ্যে চিন্তা নেই বিষয়টি এমন নয়। বরং বলা যায় যতটুকু আগানোর দরকার ছিল ততটুকু অগ্রসর হওয়া সম্ভব হয়নি।

স্মারক প্রতিনিধি : বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। দলের মহাসচিব হিসেবে বাবার রেখে যাওয়া এ দলটিকে কতটুকু এগিয়ে নিতে পেরেছেন বলে মনে করেন

মাওলানা মাহফুজুল হক: দলকে এগিয়ে নিতে পেরেছি এটা বলার সুযোগ নেই। বাস্তবতার নিরিখে আমার টার্গেট ছিল দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দল যেন পিছিয়ে না পড়ে সে ব্যাপারে সচেষ্ট থেকেছি। তারপরও বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে সাংগঠনিকভাবে অগ্রসর করতে না পারলেও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাথে সম্পৃক্ত কিছু নেতৃবৃন্দের প্রতি এদেশের ইসলামি মহলের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গের আস্থা তৈরি করতে পেরেছি বলে মনে করি।

স্মারক প্রতিনিধি : ইসলামি আন্দোলন ও সংগঠন নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ ভাবনা কী?

মাওলানা মাহফুজুল হক: ভবিষ্যৎ ভাবনা না বলে আমি বলতে পারি ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা হলো, একটি সুন্দর নিয়মতান্ত্রিক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার আলোকে সংগঠন গড়ে উঠুক। সেক্ষেত্রে যদি আমারও ভূমিকা রাখার কোনো সুযোগ আসে বা থাকে সেখানে ভূমিকা রাখব। বাকি হায়াতে কতটুকু দেখতে পারব সেটাতো এখনো পূর্ণ নিশ্চিত না। সেটার পিছনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাকে যতটুকু যোগ্যতা দান করেছেন বিভিন্ন নিসবতের কারণে- শাইখুল হাদীস রহ. এর নেসবত, জামিয়া রাহমানিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্বে থাকার নিসবত, আমাদের ওলামায়ে কেরামের সর্ববৃহৎ প্লাটফর্ম আল হাইয়াতুল উলইয়া, বেফাকের মতো সব জায়গাতে মুরুব্বিরা স্নেহ করে সাথে রাখেন। এটা আল্লাহ প্রদত্ত যোগ্যতা। পাশাপাশি মানুষের মাঝে আস্থাভাজন হওয়ার উসিলা। আল্লাহ তায়ালা সুযোগ দিলে এসব কিছুকেই কাজে লাগানো এটাই আমার প্রত্যাশা।

স্মারক প্রতিনিধি : ডাকসু কর্তৃক ইসলামি রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়ে বড়দের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ আছে কিনা?

মাওলানা মাহফুজুল হক : বড়দের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ আমিতো এখনো লক্ষ করিনি। আর যেহেতু ডাকসু ছাত্রদের সংগঠন, তাই এক্ষেত্রে ছাত্র সংগঠনগুলোরই মজবুতভাবে আগানো প্রয়োজন। আর ছাত্র সংগঠনের পিছনে তো বড়রা আছেনই।

স্মারক প্রতিনিধি : অনেকে বলে, ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোতে তো ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ, এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও নিষিদ্ধ হচ্ছে। এটা নিয়ে আন্দোলন করাটা অনেকটাই ডাবল স্ট্যান্ডবাজী?

মাওলানা মাহফুজুল হক : এখানে ডাবল স্ট্যান্ডবাজী হচ্ছে না। কারণ ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোতে তো ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকে। সেখানে সব ধরনের ছাত্র সংগঠনই তো নিষিদ্ধ। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামি রাজনীতি নিষিদ্ধ করে অন্য সকল সংগঠনের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। শুধু সুযোগই না, বরং তাদেরকে কিভাবে আরও মজবুত অবস্থানে নিয়ে যাওয়া যায় সেই চেষ্টারই অংশ হিসেবে এ ধরনের উদ্যোগ। তাই এটাকে ওটার সাথে মিলানোর ন্যূনতম সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।
ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইসলামি রাজনীতি নিষিদ্ধ এমনটা তেমন কোথাও নেই। প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সবাই ভূমিকা রাখে। আর আমি আগেই বলে এসেছি ইসলামি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ আমরাই এটাকে সমাজে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারিনি। যার কারণে বিভিন্ন জায়গার প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা, বাধ্যবাধকতা আছে।

স্মারক প্রতিনিধি : যুব মজলিসের দশবছর পূর্তি সম্মেলনকে কীভাবে দেখছেন?

মাওলানা মাহফুজুল হক: এ সম্মেলনটা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ বলেই আমি মনে করি। বিশেষত ইসলামি আন্দোলনের ময়দানে দশবছর খুব দীর্ঘ সময় না। পাশাপাশি ইসলামি আন্দোলনের এ ক্রান্তিকালে একটি যুব সংগঠনের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো ময়দানে সম্মেলন করার উদ্যোগ এটা অত্যন্ত আশা জাগানিয়া একটি বিষয়। সেই সাথে সম্মেলন সুন্দর, সফলভাবে বাস্তবায়ন হোক সেই প্রত্যাশা করি।

স্মারক প্রতিনিধি : যুব মজলিসের কর্মীদের সম্পর্কে কিছু বলুন।

মাওলানা মাহফুজুল হক: যুব মজলিসের কর্মীদের উদ্দেশ্যে কয়েকটি কথা- যুব মজলিসের প্রতিটি কর্মীর নিয়তকে পরিশুদ্ধ রাখা। আর সংগঠনের কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত আমলের বিষয়টাকেও সকলে যেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ব্যক্তিগত আমলের ব্যাপারে সযত্ন হতে সুরা মুযযাম্মিলে নির্দেশনা দিয়েছেন। দিনের বেলা মানুষের মাঝে দীনের কাজ নিয়ে ছুটাছুটির পাশাপাশি রাতের বেলা ব্যক্তিগত আমলে বিশেষভাবে নিয়োজিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এর থেকে আমরা বুঝতে পারি যত কর্মব্যস্ততাই থাকুক, দীনের কাজে সফলতা অর্জনের জন্য রাতের কিছু অংশ বের করে সেখানে ব্যক্তিগত আমলে নিয়োজিত হওয়া। এটা হলো ইসলামি আন্দোলনের নেতা কর্মীদের জন্য বড় শক্তি। এ শক্তিটা অর্জনের পিছনেও সকলকে সচেষ্ট থাকতে হবে।
সবাই যেন ইসলামি আন্দোলনের কর্মী হতে পারাটাতেই গর্ববোধ করে। নেতা হওয়ার মানসকিতা যেন পরিহার করে। ইসলামি আন্দোলনের কর্মী হওয়াটাকেই নিজেদের স্বপ্ন, মাকসাদ-উদ্দেশ্য বানায়। আর কর্মী হিসেবে সময়ের প্রয়োজনে নেতৃত্বের দায়িত্ব যদি কাঁধে চেপে বসে, তাহলে আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা করে সে দায়িত্ব পালনে নিজের সাধ্য, মেধা, হিম্মতের সবটুকু উজাড় করে যেন চেষ্টা করে। নেতৃত্বের আশা-লোভ কারো মধ্যেই যেন কখনো বাসা না বাঁধে।
বর্তমানে আমাদের দেশীয় রাজনীতি এবং ইসলামি আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যেও পরস্পরে নেতিবাচক আলোচনা-সমালোচনা ব্যাপক মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। যুব মজলিসের কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলব, এর থেকে বেরিয়ে এসে ওই বিষয়গুলোকেই আমরা ইতিবাচকভাবে আলোচনা করতে অভ্যস্থ হয়ে উঠব। যার টার্গেট কাজ তার কিন্তু সমালোচনা শোনার সময় নেই, সে জবাব দিবে কখন! যার সামনে কাজ নেই, তার কাজই হলো সমালোচনা করা। আবার সেই সমালোচনার বিরূদ্ধে সমালোচনা করা। আমি মনে করি, যুব মজলিসের প্রত্যেকটা কর্মী কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। তাদের সামনে কাজের বিশাল সুযোগ আছে। তারা কাজের মধ্যে এ পরিমাণ ব্যস্ত থাকবে, সমালোচনা শোনারও যেন তাদের সুযোগ না থাকে। সমালোচনা নিয়ে ভাববারও যেন সুযোগ না পায়। জবাব দিবে তো দূরের কথা।

শেয়ার করুন
Scroll to Top